বর্তমান সময়টা যেন পাল্টে দিয়েছে শোবিজের চালচিত্র। একটা সময় ছিল যখন বাংলা নাটক সিনেমার জন্য দর্শকরা সব কাজ বন্ধ করে অপেক্ষা করতেন। প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাবলীল অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে টিভির পর্দার সামনে কাটিয়ে দিতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। তবে তা এখন অতীত, বাংলা নাটক-সিনেমা হারিয়ে ফেলেছে তার পুরনো জৌলুস। মানহীন স্ক্রিপ্ট,বাজে অঙ্গভঙ্গি এবং তথাকথিত ভাইরাল অভিনেতা-অভিনেত্রী। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ের নাটকের প্রধান উপকরণ। যে নির্মাতা নাটকে যত বেশি নোংরা ভাষা ব্যবহার করতে পারেন,সেই নাটক তত হিট।
ভাইরালের নেশা এতটাই প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে,বর্তমানে বহুল বিতর্কিত টিকটকার রিধিকে নাটকের অভিনেত্রী হিসেবে দেখাতে যাচ্ছে টিভি স্ক্রিনে। স্যোশাল মিডিয়ায় বিশেষ নামে পরিচিত এই রিধির নানা রকম কুরুচিপূর্ণ ভিডিও এবং অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিতে রীতিমতো তোলপাড় টিকটক,ইউটিউব থেকে অন্যান্য প্লাটফর্মগুলো৷ অর্থের বিনিময়ে নানা রকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্যোশাল মিডিয়ার বদৌলতে এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপনের মাধ্যমে রিধি নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করেছেন অর্থের বিনিময়ে লুফে নিন অফারে। অবশেষে এমন একজন টিকটকারকেও নাট্যপ্রেমিদের দেখতে হবে টিভি স্ক্রিনে। বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো হতাশ নাট্যাঙ্গনের মানুষেরা।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন লেখক এবং অভিনেতা ফরহাদ লিমন। এই অভিনেতা বলেন, 'অসুস্থতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে না তো আমাদের মানসিকতা? একসময় বাংলাদেশের নাটক দেখার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশেও বুস্টার লাগিয়ে, এন্টেনা দিয়ে বসে থাকতো। আর আজ আমরা দুটো ভিউ পাবার আশায় যাকে তাকে ধরে এনে নাটকে যুক্ত করছি। মূল শর্ত - ভাইরাল হলেই হবে; সেটা যেভাবেই হোক না কেন..'
তিনি বলেন,' উপরের ছবিতে গোল চিহ্ন দেয়া মেয়েটার টাইটেল *** আপু !!! তিনি বিভিন্ন সময়ে তার বান্ধবীদের স্বামীর সাথে কক্সবাজারে ও অন্যান্য জায়গায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে ধরা খেয়েছেন। তাকে তার বান্ধবীরা মারধর করেছে, এমন ভিডিও ইউটিউবে আছে। সেই মেয়ে লাইভে এসে, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে ইন্টার্ভিউ দিয়ে জানিয়েছে, এগুলো সে উপভোগ করে!! এই জাতীয় মেয়েকে আমরা আলাদা কিছু সম্বোধন করি, যা ফেসবুকে বলা শোভন হবে না। আমার কথা বিশ্বাস না হলে শুগলে শুধু *** আপু লিখেন, সত্যতা পেয়ে যাবেন। এই '*** আপু'রাই আমাদের মিডিয়ার ভবিষ্যত হচ্ছে। অসুস্থ ভিউ দৌড়ের অদ্ভুত প্রাপ্তি।'
মিলন লিখেছেন, 'কয়দিন আগে দেখলাম, কোভিড এর সময় জাল সার্টিফিকেট বিক্রি করে জেল খাটা নারী ডাক্তার সাবরিনা অভিনয় করছেন নামকরা এক অভিনেতার সঙ্গে। এদিকে চুরি করে ধরা পড়া সিদ্দিক চোরা চিফ গেস্ট এক অনুষ্ঠানের। হাবিজাবি গান গেয়ে, অসুস্থ অঙ্গভঙ্গি করে ভাইরাল হওয়া হিরো আলম বড় বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন করেছিল। কোনো সংগঠন এসব থামাতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের নৈতিক অবক্ষয় বন্ধ হয়। সামনে কেউ আর আর্ট কালচার শিখতে চাইবে না। যে কোনো পদ্ধতিতে ভাইরাল হবে। সেটা কাউকে মেরে হোক, জামা কাপড় খুলে হোক, আজেবাজে কথা বলে হোক, চুরি করে হোক, ভাইরাল হলেই টাকা, স্পন্সর, সুখের জীবন।'
সবশেষে তিনি বলেন, 'আমরা যারা অভিনয় শিল্পী, আমাদের অনেক সময় জানানোই হয় না কে কে আছে নাটকে, আমরা অনেক সময় এদের চিনিও না, হয়তো দুটো টাকার জন্য কাজ করতে যাই, কিন্তু মনে অতৃপ্তি, আক্ষেপ থেকেই যায়।ছবিতে আমার বন্ধু অত্যন্ত ভালো মানুষ আশরাফুল সোহাগ এর জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম। আমার এই পোস্টে কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা উদ্দেশ্য নয়। যেন আমরা আমাদের শিল্প সংস্কৃতির ভবিষ্যত ভেবে এখনই সাবধান হই। আমার এই পোস্টে সমাজের ক্রমবর্ধমান মানসিক বিকৃতির প্রতি সমবেদনা, ও আমার মিডিয়ার শ্রদ্ধেয় নির্মাতা সম্প্রদায়ের প্রতি সুস্থ চর্চার আকুল আবেদন। শহরে আগুন লাগলে কতক্ষন আর পিঠ দিয়ে নিজেকে বাঁচাবেন?'